অনুশাসনপর্ব: ১৮। মাংসাহার

বৃহস্পতি চ'লে গেলে যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, আপনি বহু বার বলেছেন যে অহিংসা পরম ধর্ম্ম; আপনার কাছে এও শুনেছি যে পিতৃগণ আমিষ ইচ্ছা করেন সেজন্য শ্রাদ্ধে বহুবিধ মাংস দেওয়া হয়। হিংসা না করলে মাংস কোথায় পাওয়া যাবে? ভীষ্ম বললেন, যাঁরা সৌন্দর্য্য স্বাস্থ্য আয়ু বুদ্ধি বল ও স্মরণশক্তি চান তাঁরা হিংসা ত্যাগ করেন। স্বায়ম্ভুব মনু বলেছেন, যিনি মাংসাহার ও পশুহত্যা করেন না তিনি সর্ব্ব জীবের মিত্র ও বিশ্বাসের পাত্র। নারদ বলেছেন, যে পরের মাংস দ্বারা নিজের মাংস বৃদ্ধি করতে চায় সে কষ্ট ভোগ করে। মাংসাশী লোক যদি মাংসাহার ত্যাগ করে তবে যে ফল পায়, বেদাধ্যয়ন ও সকল যজ্ঞের অনুষ্ঠান ক'রেও সেরূপ ফল পেতে পারে না। মাংসভোজনে আসক্তি জন্মালে তা ত্যাগ করা কঠিন; মাংসবর্জ্জন-ব্রত আচরণ করলে সকল প্রাণী অভয় লাভ করে। যদি মাংসভোজী না থাকে তবে কেউ পশুহনন করে না, মাংসখাদকের জন্যই পশুঘাতক হয়েছে। মনু বলেছেন, যজ্ঞাদি কর্মে এবং শ্রাদ্ধে পিতৃগণের উদ্দেশ্যে যে মন্ত্রপূত সংস্কৃত মাংস নিবেদিত হয় তা পবিত্র হবি স্বরূপ, তা ভিন্ন অন্য মাংস বৃথা মাংস এবং অভক্ষ্য। যুধিষ্ঠির বললেন, মাংসাশী লোকে পিষ্টক শাক প্রভৃতি স্বাদ্বু খাদ্য অপেক্ষা মাংসই ইচ্ছা করে; আমিও মনে করি মাংসের তুল্য সরস খাদ্য কিছুই নেই। অতএব আপনি মাংসাহার ও মাংসবর্জনের দোষগুণ বলুন। ভীষ্ম বললেন, তোমার কথা সত্য, মাংস অপেক্ষা স্বাদ্বু কিছু নেই। কৃশ দুর্ব্বল ইন্দ্রিয়সেবী ও পথশ্রান্ত লোকের পক্ষে মাংসই শ্রেষ্ঠ খাদ্য, তাতে সদ্য বলবৃদ্ধি ও পুষ্টি হয়। কিন্তু যে লোক পরমাংস দ্বারা নিজ মাংস বৃদ্ধি করতে চায় তার অপেক্ষা ক্ষুদ্র ও নৃশংসতর কেউ নেই। বেদে আছে, পশুগণ যজ্ঞের নিমিত্ত সৃষ্ট হয়েছে, অতএব যজ্ঞ ভিন্ন অন্য কারণে পশুহত্যা রাক্ষসের কার্য্য। পুরাকালে অগস্ত্য অরণ্যের পশুগণকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন, সেজন্য ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মৃগয়া প্রশংসনীয়। লোকে মরণ পণ ক’রে মৃগয়ায় প্রবৃত্ত হয়, হয় পশু মরে নতুবা মৃগয়াকারী মরে; দুইএরই সমান বিপদের সম্ভাবনা, এজন্য মৃগয়ায় দোষ হয় না। কিন্তু সর্ব্বভূতে দয়ার তুল্য ধর্ম্ম নেই, দয়ালু তপস্বীদের ইহলোকে ও পরলোকে জয় হয়। প্রাণদানই শ্রেষ্ঠ দান; আত্মা অপেক্ষা প্রিয়তর কিছু নেই, অতএব আত্মবান মানবের সকল প্রাণীকেই দয়া করা উচিত। যারা পশুমাংস খায়, পরজন্মে তারা সেই পশু কর্তৃক ভক্ষিত হয়। আমাকে (মাং) সে (সঃ) পূর্ব্বজন্মে খেয়েছে, অতএব আমি তাকে খাব — ‘মাংস’ শব্দের এই তাৎপর্য্য।