আশ্বমেধিকপর্ব: ৪। অনুগীতা

একদা এক রমণীয় স্থানে বিচরণ করতে করতে অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন— কেশব, সংগ্রামের সময় আমি তোমার মাহাত্ম্য জেনেছিলাম, তোমার দিব্য রূপ ও ঐশ্বর্যও দেখেছিলাম। তুমি সুহৃদ্ভাবে আমাকে পূর্বে যে সকল উপদেশ দিয়েছিলে আমি বুদ্ধির দোষে তা ভুলে গেছি। তুমি শীঘ্রই দ্বারকায় ফিরে যাবে, সেজন্য এখন আবার সেই উপদেশ শুনতে ইচ্ছা করি। অর্জুনকে আলিঙ্গন ক'রে কৃষ্ণ বললেন, আমি তোমাকে নিগূঢ় সনাতন ধর্মতত্ত্ব এবং শাশ্বত লোক সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু বুদ্ধির দোষে তুমি তা গ্রহণ করতে পার নি, এতে আমি দুঃখিত হয়েছি। আমি যোগযুক্ত হয়ে পূর্বে যে ব্রহ্মতত্ত্ব বিবৃত করেছিলাম এখন আর তা বলতে পারব না। যাই হোক, এক সিদ্ধ ব্রাহ্মণ ধর্মাত্মা কাশ্যপকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তাই আমি বলছি শোন। —

মানুষ পুণ্যকর্মের ফলে উত্তম গতি পায় এবং দেবলোকে সুখভোগ করে, কিন্তু এই অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। অতি কষ্টে উত্তম লোক লাভ হ'লেও তা থেকে বার বার পতন হয়। দেহধারী জীব বিপরীত বুদ্ধির বশে অসৎ কর্মে প্রবৃত্ত হয়; সে অতিভোজন করে বা অনাহারে থাকে, পরস্পরবিরোধী বস্তু ভোজন ও পান করে, ভুক্ত খাদ্য জীর্ণ না হতেই আবার খায়, দিবসে নিদ্রা যায়, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা স্ত্রীসংসর্গের ফলে দুর্বল হয়। এইরূপে সে বায়ু পিত্তাদি প্রকোপিত করে এবং পরিশেষে প্রাণান্তকর রোগের কবলে পড়ে। কেউ কেউ উদ্বন্ধনাদির দ্বারা আত্মহত্যা করে।

দেহত্যাগের সময় শরীরস্থ উষ্মা বায়ু দ্বারা প্রকোপিত হয়ে মর্মস্থান ভেদ করে, তখন জীবাত্মা বেদনাগ্রস্ত হয়ে দেহ থেকে নির্গত হন। সকল জীবই বার বার জন্মমৃত্যু ভোগ করে; মৃত্যুকালে যেমন জন্মকালেও তেমন ক্লেশ পায়। সনাতন জীবাত্মাই দেহের মধ্যে থেকে সকল কার্য সম্পাদন করেন। মৃত্যু হলেও তাঁর কৃত কর্মসকল তাঁকে ত্যাগ করে না, সেই কর্মবন্ধনের ফলে জীবের আবার জন্ম হয়। চক্ষুষ্মান লোকে দেখে — অন্ধকারে খদ্যোত কখনও প্রকাশিত হচ্ছে কখনও লীন হচ্ছে, সেইরূপ সিদ্ধ পুরুষ জ্ঞানচক্ষু দ্বারা জীবের জন্ম মরণ ও পুনর্বার গর্ভ-প্রবেশ দেখতে পান। সংসার রূপ কর্মভূমিতে শুভাশুভ কর্ম ক'রে কেউ এখানেই ফলভোগ করে, কেউ পুণ্যবলে স্বর্গে যায়, কেউ অসৎ কর্মের ফলে নরকে পতিত হয়; সেই নরক থেকে মুক্তিলাভ অতি দুর্লভ। মৃত্যুর পর পুণ্যাত্মারা চন্দ্র সূর্য অথবা নক্ষত্রলোকে যান, কর্মক্ষয় হলে আবার তাঁরা মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন; এইরূপ যাতায়াত বার বার ঘটে। স্বর্গেও উচ্চ মধ্যম ও নীচ স্থান আছে।

শুক্র ও শোণিত সংযুক্ত হয়ে স্ত্রীজাতির গর্ভাশয়ে প্রবেশ ক'রে জীবের কর্মানুসারে দেহে পরিণত হয়। দেহের অধিষ্ঠাতা জীবাত্মা অতি সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য, ইনি কোনও বিষয়ে লিপ্ত হন না। ইনিই শাশ্বত ব্রহ্ম এবং সর্বপ্রাণীর বীজস্বরূপ; এ'র প্রভাবেই প্রাণীরা জীবিত থাকে। বহ্নি যেমন অনুপ্রবিষ্ট হয়ে লৌহপিণ্ডকে তাপিত করে, সেইরূপ জীবাত্মা দেহকে সচেতন করেন। দীপ যেমন গৃহকে প্রকাশিত করে, সেইরূপ চেতনা শরীরকে সংবেদনশীল করে।

যত কাল মোক্ষধর্মের উপলব্ধি না হয় তত কাল জীব জন্মজন্মান্তরে শুভাশুভ কর্মে প্রবৃত্ত হয়ে তার ফলভোগ করে। দান ব্রত ব্রহ্মচর্য বেদাভ্যাস প্রশান্ততা অনুকম্পা সংযম অহিংসা, পরধনে অলোভ, মনে মনেও প্রাণিগণের অহিত না করা, পিতামাতার সেবা, গুরু দেবতা ও অতিথির পূজা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, এবং শুভজনক কর্মের অনুষ্ঠান — সাধুদের এইসকল স্বভাবসিদ্ধ। এইরূপ সদাচারেই ধর্ম বর্ধিত হয় এবং প্রজ্ঞা চিরকাল পালিত হয়। সদাচারপরায়ণ সাধু অপেক্ষা যোগী শ্রেষ্ঠ, তিনি শীঘ্র মুক্তিলাভ করেন। যিনি বুঝেছেন যে সুখ-দুঃখ অনিত্য, শরীর অপবিত্র বস্তুর সমষ্টি, বিনাশ কর্মেরই ফল, এবং সকল সুখই দুঃখ, তিনি এই ঘোর সংসারসাগর উত্তীর্ণ হতে পারেন। জন্মমরণশীল রোগসংকুল প্রাণিসমূহের দেহে যিনি একই চৈতন্যময় সত্ত্ব দেখেন তিনি পরম পদের অন্বেষণ করলে সিদ্ধিলাভ করেন।

যিনি সকলের মিত্র, সর্ব বিষয়ে সহিষ্ণু, শান্ত ও জিতেন্দ্রিয়, যাঁর ভয় ক্রোধ অভিমান নেই, যিনি পবিত্রস্বভাব এবং সর্বভূতের প্রতি আত্মবৎ আচরণ করেন, জন্ম-মৃত্যু সুখ-দুঃখ লাভ-অলাভ প্রিয়-অপ্রিয় সমান জ্ঞান করেন, যিনি অপরের দ্রব্য কামনা করেন না, কাকেও অবজ্ঞা করেন না, যাঁর শত্রু-মিত্র নেই, সন্তানে আসক্তি নেই, যিনি আকাঙ্ক্ষাশূন্য এবং ধর্ম-অর্থ-কাম পরিহার করেছেন, যিনি ধার্মিক নন অধার্মিকও নন, যাঁর চিত্ত প্রশান্ত হয়েছে, তিনি আত্মাকে উপলব্ধি ক’রে মুক্তিলাভ করেন। যিনি বৈরাগ্যমুক্ত, সতত আত্মদোষদর্শী, আত্মাকে নির্গুণ অথচ গুণভোক্তা রূপে দেখেন, শারীরিক ও মানসিক সকল সংকল্প ত্যাগ করেছেন, তিনিই ইন্ধনহীন অনলের ন্যায় ক্রমশ নির্বাণ লাভ করেন। যিনি সর্বসংস্কারমুক্ত নির্দ্বন্দ্ব, এবং কিছুই নিজের ব’লে মনে করেন না, তিনিই সনাতন অক্ষর ব্রহ্ম লাভ করেন। তপস্যা দ্বারা ইন্দ্রিয়সকলকে বিষয় থেকে নিবৃত্ত ক’রে একান্তমনে যোগনিরত হ’লে হৃদয়মধ্যে পরমাত্মার দর্শন পাওয়া যায়। যেমন স্বপ্নে কিছু দেখলে জাগরণের পরেও তার জ্ঞান থাকে, সেইরূপ যোগাবস্থায় পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করলে যোগভঙ্গের পরেও সেই উপলব্ধি থাকে।

তার পর কৃষ্ণ বিবিধ উপাখ্যানের প্রসঙ্গে, সবিস্তারে অধ্যাত্মতত্ত্ব বিবৃত করলেন। পরিশেষে তিনি বললেন, ধনঞ্জয়, তোমার প্রীতির জন্য এইসকল নিগূঢ় বিষয় বললাম; তুমি আমার উপদিষ্ট ধর্ম আচরণ কর, তা হ’লে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করবে। ভরতশ্রেষ্ঠ, আমি বহু কাল আমার পিতাকে দেখি নি, এখন তাঁর কাছে যেতে ইচ্ছা করি। অর্জুন বললেন, কৃষ্ণ, এখন হস্তিনাপুরে চল, রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তুমি দ্বারকায় যেয়ো।