আশ্বমেধিকপর্ব: ৫। কৃষ্ণের দ্বারকাযাত্রা — মরুদ্বাসী উতঙ্ক
কৃষ্ণ দ্বারকায় যেতে চান শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, পুণ্ডরীকাক্ষ, তোমার মঙ্গল হ’ক; তুমি বহু দিন পিতামাতাকে দেখ নি, এখন তাঁদের কাছে যাওয়া তোমার কর্তব্য। দ্বারবতী পুরীতে গিয়ে তুমি আমার মাতুল বসুদেব, দেবী দেবকী, এবং বলদেবকে আমাদের অভিবাদন জানিও, আমাকে ও আমার ভ্রাতৃগণকে নিত্য স্মরণে রেখো, আমার অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় আবার এখানে এসো।
ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, পিতৃস্বসা কুন্তী ও বিদুর প্রভৃতির নিকট বিদায় নিয়ে কৃষ্ণ তাঁর ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে রথারোহণে যাত্রা করলেন। বিদুর ভীমার্জুনাদি ও সাত্যকি তাঁর পশ্চাতে গেলেন। কিছু দূর গিয়ে তিনি বিদুর প্রভৃতিকে নিবর্তিত ক’রে দারুক ও সাত্যকিকে বললেন, বেগে রথ চালাও। কৃষ্ণ ও অর্জুন বহুক্ষণ পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলেন, তার পর রথ দৃষ্টিপথের বাহিরে গেলে অর্জুনাদি হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন।
কৃষ্ণের যাত্রাপথে বহুপ্রকার শুভ লক্ষণ দেখা গেল। বায়ু সবেগে প্রবাহিত হয়ে রথের সম্মুখ পথের ধূলি কঙ্কর ও কণ্টক দূর করলেন, ইন্দ্র সুগন্ধ বারি ও দিব্য পুষ্প বর্ষণ করতে লাগলেন। কিছু দূরে যাবার পর কৃষ্ণ মরুপ্রদেশে উপস্থিত হয়ে মুনিশ্রেষ্ঠ উত্তঙ্কের দর্শন পেলেন। পরস্পর অভিবাদন ও কুশলজিজ্ঞাসার পর উত্তঙ্ক বললেন, শৌরি, তোমার যত্নে কুরু-পাণ্ডবদের মধ্যে সৌভ্রাত্র স্থাপিত হয়েছে তো? কৃষ্ণ বললেন, আমি সন্ধির জন্য বহু চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু তা সফল হয় নি। বুদ্ধি বা বল দ্বারা দৈবকে অতিক্রম করা যায় না; ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ সবান্ধবে যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করেছেন, কেবল পঞ্চপাণ্ডব জীবিত আছেন, তাঁদেরও পুত্রমিত্র নিহত হয়েছেন। উত্তঙ্ক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, কৃষ্ণ, তুমি সমর্থ হয়েও কুরু-পুংগবগণকে রক্ষা কর নি, তোমার মিথ্যাচারের জন্যই কুরুকুল বিনষ্ট হয়েছে, আমি তোমাকে শাপ দেব। বাসুদেব বললেন, আমি অনুনয় করছি, শাপ দেবেন না। অল্প তপস্যার প্রভাবে আমাকে কেউ পরাভূত করতে পারেন না। আমি জানি যে আপনি কৌমার ও ব্রহ্মচর্য পালন করে তপঃসিদ্ধ হয়েছেন, গুরুকেও তুষ্ট করেছেন; আপনার তপস্যা আমি নষ্ট করতে ইচ্ছা করি না।
তার পর কৃষ্ণ তাঁর দিব্য ঐশ্বর্য সকল বিবৃত করলেন এবং উত্তঙ্কের অনুরোধে বিশ্বরূপ দেখালেন। উত্তঙ্ক বিস্ময়াপন্ন হয়ে বললেন, হে বিশ্বকর্মা, বিশ্বাত্মা বিশ্বসম্ভব, তোমাকে নমস্কার করি, তুমি পদদ্বয় দ্বারা পৃথিবী, মস্তক দ্বারা গগন, জঠর দ্বারা দ্যুলোক-ভূলোকের মধ্যদেশ, এবং ভুজ দ্বারা দিক্সমূহ ব্যাপ্ত ক’রে আছ; দেব, তোমার এই মহৎ রূপ সংবরণ করে পূর্বরূপ ধারণ কর। কৃষ্ণ পূর্বরূপ গ্রহণ ক’রে প্রসন্ন হয়ে বললেন, মহর্ষি, আপনি অভীষ্ট বর প্রার্থনা করুন। উত্তঙ্ক বললেন, পুরুষোত্তম, তোমার যে রূপ দেখেছি তাই আমার পক্ষে পর্যাপ্ত বর। যদি নিতান্তই বর দেওয়া কর্তব্য মনে কর তবে এই বর দাও যেন এই মরুভূমিতে ইচ্ছানুসারে জল পেতে পারি। কৃষ্ণ বললেন, জলের প্রয়োজন হ’লেই আমাকে স্মরণ করবেন। এই ব’লে কৃষ্ণ প্রস্থান করলেন।
কিছু কাল পরে একদিন উত্তঙ্ক মরুভূমিতে চলতে চলতে তৃষিত হয়ে কৃষ্ণকে স্মরণ করলেন। তখন এক দিগম্বর মলিনদেহ চণ্ডাল তাঁর কাছে উপস্থিত হ’ল, তার সঙ্গে কুকুরের দল, হাতে খড়্গ ও ধনুবাণ; তার অধোদেশে জলস্রোত (প্রস্রাব) প্রবাহিত হচ্ছে। চণ্ডাল সহাস্যে বললে, ভৃগুবংশজাত উত্তঙ্ক, তুমি আমার এই জল পান কর। উত্তঙ্ক পিপাসার্ত হয়েও সেই জল নিলেন না, ক্রুদ্ধ হয়ে তিরস্কার করলেন। চণ্ডাল অন্তর্হিত হ’ল। তার পর শঙ্খচক্রগদাধর কৃষ্ণকে দেখে উত্তঙ্ক বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণকে চণ্ডালের প্রস্রাব দেওয়া তোমার উচিত নয়। কৃষ্ণ সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আপনাকে অমৃত দেবার জন্য আমি ইন্দ্রকে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, মানুষকে অমরত্ব দেওয়া অকর্তব্য; যদি উত্তঙ্ককে অমৃত দিতেই হয় তবে আমি চণ্ডালের রূপে দিতে যাব, যদি তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেন তবে অমৃত পাবেন না। মহর্ষি, আপনি চণ্ডালরূপী ইন্দ্রকে ফিরিয়ে দিয়ে অন্যায় করেছেন। যাই হ’ক, আমি বর দিচ্ছি, আপনার পিপাসা পেলেই মেঘ উদিত হয়ে এই মরুভূমিতে জলবর্ষণ করবে, সেই মেঘ উত্তঙ্ক-মেঘ নামে খ্যাত হবে। বর পেয়ে উত্তঙ্ক প্রীত হয়ে সেখানে বাস করতে লাগলেন। এখনও উত্তঙ্কমেঘ সেই মরুভূমিতে জলবর্ষণ করে।