আশ্বমেধিকপর্ব: ৬। উতঙ্কের পূর্ব্ববৃত্তান্ত

জনমেজয় প্রশ্ন করলেন, উত্তঙ্ক এমন কি তপস্যা করেছিলেন যে তিনি জগৎপ্রভু বিষ্ণুকে শাপ দিতে উদ্যত হয়েছিলেন? বৈশম্পায়ন বললেন, উত্তঙ্ক (১) অতিশয় গুরুভক্ত ও তপোনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁর গুরু গৌতমও তাঁকে অন্যান্য শিষ্য অপেক্ষা অধিক স্নেহ করতেন। একদিন উত্তঙ্ক কাষ্ঠভার এনে ভূমিতে ফেলবার সময় দেখলেন, রৌপ্যের ন্যায় তাঁর একগাছি জটা কাষ্ঠে লগ্ন হয়ে আছে। পরিশ্রান্ত ক্ষুধাতুর উত্তঙ্ক তাঁর বার্দ্ধক্যের এই লক্ষণ দেখে কাঁদতে লাগলেন। গৌতমের কন্যা দ্রুতবেগে এসে উত্তঙ্কের অশ্রু অঞ্জলিতে ধারণ করলেন, তাতে তাঁর হস্ত দগ্ধ হ’ল। গৌতম জিজ্ঞাসা করলেন, বৎস, তুমি শোকার্ত হ’লে কেন? উত্তঙ্ক বললেন, আমি শতবর্ষ আপনার প্রিয়সাধন করেছি; এতদিন আমার বার্দ্ধক্য জানতে পারি নি, সুখভোগও করি নি। আমার চেয়ে যারা ছোট এমন শত সহস্র শিষ্য কৃতকার্য হয়ে আপনার আদেশে গৃহে ফিরে গেছে। গৌতম বললেন, তোমার শুশ্রূষায় প্রীত হয়ে আমি জানতে পারি নি যে এত দীর্ঘকাল আমার কাছে আছ; এখন আজ্ঞা দিচ্ছি তুমি গৃহে যাও।

(১) আদিপর্ব ৩-পরিচ্ছেদে উত্তঙ্কের উপাখ্যান কিছু অন্যপ্রকার, তিনি জনমেজয়ের সমকালীন।

উত্তঙ্ক বললেন, ভগবান, আপনাকে গুরুদক্ষিণা কি দেব? গৌতম বললেন, তুমি আমাকে পরিতুষ্ট করেছ, তাই গুরুদক্ষিণা। তুমি যদি ষোড়শবর্ষীয় যুবা হও তবে তোমাকে আমার কন্যা দান করব, সে ভিন্ন আর কেউ তোমার তেজ ধারণ করতে পারবে না। উত্তঙ্ক তখনই যুবা হয়ে গুরুকন্যার পাণিগ্রহণ করলেন এবং গৌতমের আদেশ নিয়ে গুরুপত্নীকে বললেন, আপনাকে কি দক্ষিণা দেব বলুন। বার বার অনুরোধের পর অহল্যা বললেন, সৌদাস রাজার মহিষী যে দিব্য মণিময় কুণ্ডল ধারণ করেন তাই এনে দাও। উত্তঙ্ক কুণ্ডল আনতে গেছেন শুনে গৌতম দুঃখিত হয়ে অহল্যাকে বললেন, সৌদাস বশিষ্ঠের শাপে রাক্ষস হয়েছেন, তাঁর কাছে উত্তঙ্ককে পাঠানো উচিত হয় নি। অহল্যা বললেন, আমি তা জানতাম না; তোমার আশীর্বাদে উত্তঙ্কের কোনও অমঙ্গল হবে না।

দীর্ঘশ্মশ্রুধারী শোণিতাক্তদেহ ঘোরদর্শন সৌদাসকে দেখে উত্তঙ্ক ভীত হলেন না। সৌদাস বললেন, ব্রাহ্মণ, আমি আহার অন্বেষণ করছিলাম, তুমি উপযুক্ত কালে এসেছ। উত্তঙ্ক বললেন, মহারাজ, আমি গুরুপত্নীর জন্য আপনার মহিষীর কুণ্ডল ভিক্ষা করতে এসেছি; আমি প্রতিজ্ঞা করছি, গুরুপত্নীকে কুণ্ডল দিয়ে আপনার কাছে ফিরে আসব। সৌদাস সম্মত হয়ে বললেন, বনমধ্যে নির্ঝরের নিকট আমার পত্নীকে দেখতে পাবে।

সৌদাসমহিষী মদয়ন্তীর নিকট উপস্থিত হয়ে উত্তঙ্ক তাঁর প্রার্থনা জানালেন। মদয়ন্তী বললেন, দেবতা যক্ষ ও মহর্ষিগণ আমার কুণ্ডল হরণ করবার জন্য সর্বদা চেষ্টা করেন। এই কুণ্ডল ভূমিতে রাখলে সর্পগণ, উচ্ছিষ্ট অবস্থায় ধারণ করলে যক্ষগণ, এবং নিদ্রাকালে ধারণ করলে দেবগণ অপহরণ করেন। এই কুণ্ডল সর্বদা সুবর্ণ ক্ষরণ করে, রাত্রিকালে নক্ষত্র ও তারাগণের প্রভা আকর্ষণ করে, ধারণ করলে ক্ষুধা পিপাসা এবং অগ্নি বিষ প্রভৃতির ভয় দূর হয়। ব্রাহ্মণ, তুমি মহারাজের অভিজ্ঞান নিয়ে এস তবে কুণ্ডল পাবে।

উত্তঙ্ক অভিজ্ঞান চাইলে সৌদাস বললেন, তুমি মহিষীকে এই কথা বলো—আমার এই দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবার অন্য উপায় নেই; তুমি তোমার কুণ্ডলদ্বয় দান কর। উত্তঙ্ক সৌদাসের এই বাক্য জানালে মদয়ন্তী তাঁকে কুণ্ডল দিলেন। উত্তঙ্ক সৌদাসের কাছে এসে বললেন, মহারাজ, মহিষী কুণ্ডল দিয়েছেন; আমি প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করব না, কিন্তু আজ আপনার সঙ্গে আমার মিত্রতা হয়েছে, আমাকে বধ করলে আপনার মিত্রহত্যার পাপ হবে। আপনিই বলুন, আপনার কাছে আবার আসা আমার উচিত কিনা। সৌদাস বললেন, আমার কাছে ফিরে এলে নিশ্চয় তোমাকে মরতে হবে, অতএব আর এসো না।

মৃগচর্মের উত্তরীয়ে কুণ্ডল বেঁধে উত্তঙ্ক দ্রুতবেগে গৌতমের আশ্রমে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে ক্ষুধিত হয়ে তিনি একটি বিল্ব বৃক্ষে উঠে ফল পাড়তে লাগলেন, সেই সময়ে কুণ্ডলসহ তাঁর উত্তরীয় ভূমিতে পড়ে গেল। ঐরাবতবংশজাত এক সর্প কুণ্ডলদ্বয় মুখে নিয়ে বল্মীকমধ্যে প্রবেশ করলে। বৃক্ষ থেকে নেমে উত্তঙ্ক তাঁর দণ্ডকাষ্ঠ (ব্রহ্মচারীর যষ্টি) দিয়ে বল্মীক খুঁড়তে লাগলেন, কিন্তু পঁয়ত্রিশ দিন খুঁড়েও তিনি ভিতরে যাবার পথ পেলেন না। তখন ব্রাহ্মণবেশে ইন্দ্র এসে বললেন, নাগলোক এখান থেকে সহস্র যোজন, তুমি কেবল দণ্ডকাষ্ঠ দিয়ে পথ প্রস্তুত করতে পারবে না। এই বলে ইন্দ্র দণ্ডকাষ্ঠে তাঁর বজ্র সংযুক্ত করে দিলেন। তখন উত্তঙ্ক ভূমি বিদীর্ণ করে সুবিশাল নাগলোকে উপস্থিত হলেন। তার দ্বারদেশে একটি কৃষ্ণবর্ণ অশ্ব ছিল, তার পুচ্ছ শ্বেত, মুখ ও চক্ষু তাম্রবর্ণ। অশ্ব উত্তঙ্ককে বললে, বৎস, তুমি আমার গুহ্যদ্বারে ফুৎকার দাও; ঘৃণা করো না, আমি অগ্নি, তোমার গুরুর গুরু। উত্তঙ্ক ফুৎকার দিলে অশ্বের রোমকূপ থেকে ভয়ঙ্কর ধূম নির্গত হয়ে নাগলোকে ব্যাপ্ত হ'ল। বাসুকি প্রভৃতি নাগগণ ত্রস্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন এবং উতঙ্ককে পূজা ক'রে কুণ্ডল সমর্পণ করলেন। তার পর উতঙ্ক অগ্নিকে প্রদক্ষিণ ক'রে গুরুগৃহে ফিরে গেলেন এবং অহল্যাকে কুণ্ডল দিলেন। উপাখ্যান শেষ ক'রে বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বললেন, মহাত্মা উতঙ্ক এই প্রকারে ত্রিলোক ভ্রমণ ক'রে কুণ্ডল এনেছিলেন; তপস্যার ফলে তাঁর অসাধারণ প্রভাব হয়েছিল।