আশ্বমেধিকপর্ব: ৮। পরীক্ষিতের জন্ম

যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের কাল আগত হ’লে কৃষ্ণ তাঁর প্রতিশ্রুতি স্মরণ করলেন এবং বলরামকে অগ্রবর্তী ক’রে কনিষ্ঠ ভ্রাতা গদ, ভাগিনী সুভদ্রা, পুত্র প্রদ্যুম্ন চারুদেষ্ণ ও শাম্ব, এবং সাত্যকি কৃতবর্মা প্রভৃতি বীরগণের সঙ্গে হস্তিনাপুরে উপস্থিত হলেন।

সেই সময়ে পরীক্ষিৎ নিশ্চেষ্ট শব রূপে প্রসূত হলেন। পুরবাসিগণের হর্ষধ্বনি উত্থিত হয়েই নিবৃত্ত হ’ল। কৃষ্ণ ব্যথিত হয়ে সাত্যকির সঙ্গে অন্তঃপুরে গেলেন, কুন্তী দ্রৌপদী সুভদ্রা ও অন্যান্য কুরুনারীগণ সরোদনে তাঁকে বেষ্টন করলেন। কুন্তী বললেন, বাসুদেব, তুমিই আমাদের একমাত্র গতি, এই কুরুকুল তোমারই আশ্রিত। তোমার ভাগিনেয় অভিমন্যুর পুত্র অশ্বত্থামার অস্ত্রপ্রভাবে মৃত হয়ে জন্মেছে, তুমি তাকে জীবিত ক’রে উত্তরা সুভদ্রা দ্রৌপদী ও আমাকে রক্ষা কর। এই বালক পাণ্ডবগণের প্রাণ স্বরূপ, এবং আমার পতি শ্বশুর ও অভিমন্যুর পিণ্ডদাতা। তুমি পূর্বে বলেছিলে যে একে পুনর্জীবিত করবে, এখন সেই প্রতিজ্ঞা পালন কর। অভিমন্যু উত্তরাকে বলেছিল — তোমার পুত্র আমার মাতুলগৃহে ধনুর্বেদ ও নীতিশাস্ত্র শিখবে। মধুসূদন, আমরা বিনীত হয়ে প্রার্থনা করছি, তুমি কুরুকুলের কল্যাণ কর।

সুভদ্রা আর্তকণ্ঠে বললেন, পুণ্ডরীকাক্ষ, এই দেখ, পার্থের পৌত্রও অন্যান্য কুরুবংশীয়ের ন্যায় গতাসু হয়েছে। পাণ্ডবগণ ফিরে এসে এই সংবাদ শুনে কি বলবেন? তুমি থাকতে এই বালক যদি জীবিত না হয় তবে তোমাকে দিয়ে আমাদের কোন্ উপকার হবে? তুমি ধর্মাত্মা সত্যবাদী সত্যবিক্রম, তোমার শক্তি আমি জানি। মেঘ যেমন জলবর্ষণ করে শস্যকে সঞ্জীবিত করে সেইরূপ তুমি অভিমন্যুর মৃত পুত্রকে জীবিত কর। আমি তোমার ভগিনী, পুত্রহীনা; শরণাপন্ন হয়ে বলছি, দয়া কর।

সুভদ্রা প্রভৃতিকে আশ্বাস দিয়ে কৃষ্ণ সূতিকাগৃহে প্রবেশ ক’রে দেখলেন, সেই গৃহ শুভ্র পুষ্পমালায় সজ্জিত, চতুর্দিকে পূর্ণকলস রয়েছে, ঘৃত, তিন্দুক (গাব) কাষ্ঠের অঙ্গার, সর্ষপ, পরিষ্কৃত অস্ত্র, অগ্নি ও অন্যান্য রাক্ষসভয়বারক দ্রব্য যথাস্থানে রাখা আছে, বৃদ্ধা নারী ও দক্ষ ভিষগগণ উপস্থিত রয়েছেন। এইসকল দেখে কৃষ্ণ প্রীত হয়ে সাধু সাধু বললেন। তখন দ্রৌপদী উত্তরাকে বললেন, কল্যাণী, তোমার শ্বশুর অচিন্তাত্মা মধুসূদন এসেছেন। উত্তরা অশ্রু-সংবরণ ও দেহ আচ্ছাদন ক’রে করুণস্বরে বললেন, পুণ্ডরীকাক্ষ, দেখুন, আমি পুত্রহীনা হয়েছি, অভিমন্যুর ন্যায় আমিও নিহত হয়েছি। দ্রোণপুত্রের রহ্যাস্ত্রে বিনষ্ট আমার পুত্রকে আপনি জীবিত করুন। অশ্বত্থামার অস্ত্রমোচনকালে যদি আপনারা বলতেন — এই ইষীকা প্রসূতির প্রাণনাশ করুক, তবে ভাল হ’ত। গোবিন্দ, আমি নতশিরে প্রার্থনা করছি, এই বালককে সঞ্জীবিত করুন, নতুবা আমি প্রাণত্যাগ করব। দ্রোণপুত্র আমার সকল মনোরথ নষ্ট করেছে, আমার জীবনে কি প্রয়োজন? আমার আশা ছিল পুত্রকে কোলে নিয়ে আপনাকে প্রণাম করব, তা বিফল হ’ল। আমার চঞ্চলনয়ন স্বামী আপনার প্রিয় ছিলেন, তাঁর মৃত পুত্রকে আপনি দেখুন। এর পিতা যেমন কৃতজ্ঞ ও নিষ্ঠুর এও সেইরূপ, তাই পাণ্ডবগণের সম্পদ ত্যাগ ক’রে যমসদনে গেছে।

এইপ্রকার বিলাপ করে উত্তরা মূর্চ্ছিত হয়ে ভূপাতিত হলেন, কুন্তী প্রভৃতি তাঁকে তুলে কাঁদতে লাগলেন। সংজ্ঞালাভ ক’রে উত্তরা মৃত পুত্রকে কোলে নিয়ে বললেন, তুমি ধর্মজ্ঞের পুত্র হয়ে বৃষ্ণিপ্রবীর কৃষ্ণকে প্রণাম করছ না কেন? তুমি তোমার পিতার কাছে গিয়ে আমার হয়ে বলো — বীর, কাল পূর্ণ না হ’লে কেউ মরে না, তাই আমি পতিপুত্রহীনা হয়েও জীবিত আছি। আমি ধর্মরাজের অনুমতি নিয়ে ঘোর বিষ খাব বা অগ্নিপ্রবেশ করব। পুত্র, ওঠ, তোমার শোকার্ত্ত প্রপিতামহী কুন্তী এবং আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত কর; তোমার চঞ্চলনয়ন পিতার তুল্য যার মুখ সেই লোকনাথ পুণ্ডরীকাক্ষ কৃষ্ণকে দেখ।

কৃষ্ণ বললেন, উত্তরা, আমার কথা মিথ্যা হবে না; দেখ, সকলের সমক্ষেই এই বালককে পুনর্জীবিত করব। যদি আমি কখনও মিথ্যা না ব’লে থাকি, যুদ্ধে বিমুখ না হয়ে থাকি, যদি ধর্ম ও ব্রাহ্মণগণ আমার প্রিয় হন, তবে অভিমন্যুর এই পুত্র জীবনলাভ করুক। যদি অর্জুনের সহিত কদাচ আমার বিরোধ না হয়ে থাকে, যদি সত্য ও ধর্ম নিত্য আমাতে প্রতিষ্ঠিত থাকে, যদি কংস ও কেশীকে আমি ধর্মানুসারে বধ ক'রে থাকি, তবে এই বালক জীবিত হ'ক। বাসুদেব এইরূপ বললে শিশু ধীরে ধীরে চেতনা পেয়ে স্পন্দিত হ'তে লাগল।

অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র কৃষ্ণ কর্তৃক নিবর্ত্তিত হয়ে ব্রহ্মার কাছে চ'লে গেল। তখন বালকের তেজঃপ্রভাবে সূতিকাগৃহ আলোকিত হ'ল, রাক্ষসরা পালিয়ে গেল, আকাশবাণী হ'ল — সাধু কেশব, সাধু। বালকের অঙ্গসঞ্চালন দেখে কুরুকুলের নারীরা হৃষ্ট হলেন, ব্রাহ্মণরা স্বস্তিবচন করলেন, মল্ল নট দৈবজ্ঞ সূত মাগধ প্রভৃতি কৃষ্ণের স্তব করতে লাগল। উত্তরা পুত্রকে কোলে নিয়ে সহর্ষে কৃষ্ণকে প্রণাম করলেন। কৃষ্ণ বহু রত্ন উপহার দিলেন এবং ভরতবংশ পরিক্ষীণ হ'লে অভিমন্যুর এই পুত্র জন্মেছে এজন্য তার নাম রাখলেন — পরীক্ষিৎ। পরীক্ষিতের বয়স এক মাস হ'লে পাণ্ডবগণ ফিরে এলেন, তখন সুসজ্জিত হস্তিনাপুরে নানাপ্রকার উৎসব হ'তে লাগল।