আশ্বমেধিকপর্ব: ১০। অর্জ্জুনের নানা দেশে যুদ্ধ — বভ্রুবাহন উলূপী ও চিত্রাঙ্গদা

বিগতদেশের যেসকল বীর কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে হত হয়েছিলেন তাঁদের পুত্র-পৌত্রগণ যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞাশ্ব নেবার জন্য যুদ্ধ করতে এলেন। অর্জুন বিনয়বাক্যে তাঁদের নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করলেন কিন্তু তাঁরা শুনলেন না, অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অবশেষে তাঁরা পরাজিত হয়ে বললেন, পার্থ, আমরা সকলে আপনার কিঙ্কর, আদেশ করুন কি করব। অর্জুন বললেন, আমি আপনাদের প্রাণরক্ষা করলাম, আপনারা আমার শাসনে থাকবেন।

তার পর যজ্ঞীয় অশ্ব প্রাগজ্যোতিষপুরে উপস্থিত হ'ল, ভগদত্তের পুত্র বজ্রদত্ত তাকে হরণ করতে এলেন। তিন দিন ঘোর যুদ্ধের পর বজ্রদত্ত তাঁর মহাহস্তী অর্জুনের দিকে ধাবিত করলেন। অর্জুন নারাচের আঘাতে সেই হস্তীকে বধ করে বজ্রদত্তকে বললেন, মহারাজ, ভয় নেই, তোমার প্রাণ হরণ করব না। আগামী চৈত্রপূর্ণিমায় ধর্মরাজের অশ্বমেধ যজ্ঞ হবে, তাঁর আদেশে আমি তোমাকে নিমন্ত্রণ করছি, তুমি সেই যজ্ঞে যেয়ো। পরাজিত বজ্রদত্ত সম্মত হলেন।

অশ্ব সিন্ধুদেশে এলে সেখানকার রাজারা জয়দ্রথের নিধন স্মরণ ক'রে ক্রুদ্ধ হয়ে বিপুল সৈন্য নিয়ে অর্জুনকে আক্রমণ করলেন, কিন্তু যুদ্ধে পরাভূত হলেন। তখন ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা জয়দ্রথপত্নী দুঃশলা তাঁর বালক পৌত্রের সঙ্গে রথারোহণে অর্জুনের কাছে এলেন। ধনু ত্যাগ ক'রে অর্জুন বললেন, ভগিনী, আমি কি করব বল। দুঃশলা বললেন, তোমার ভাগিনেয় সুরথের এই পুত্র তোমাকে প্রণাম করছে, তুমি একে কৃপাদৃষ্টিতে দেখ। অর্জুন বললেন, এর পিতা কোথায়? দুঃশলা বললেন, তুমি যুদ্ধাৰ্থী হয়ে এখানে এসেছ শুনে আমার পুত্র সুরথ অকস্মাৎ প্রাণ- ত্যাগ করেছে। দুর্যোধন ও মন্দবুদ্ধি জয়দ্রথকে তুমি ভুলে যাও, তোমার ভগিনী ও তার পৌত্রের প্রতি দয়া কর। পরীক্ষিৎ যেমন অভিমন্যুর পুত্র, এই বালক তেমন সুরথের পুত্র। অর্জুন অতিশয় দুঃখিত হলেন এবং দুঃশলাকে সান্ত্বনা দিয়ে গৃহে পাঠিয়ে দিলেন।

যদৃচ্ছাব বিচরণ করতে করতে মণিপুরে এল। পিতা ধনঞ্জয় এসেছেন শুনে মণিপুরপতি বভ্রুবাহন ব্রাহ্মণগণকে অগ্রবর্তী ক’রে সবিনয়ে উপস্থিত হলেন। অর্জুন রুষ্ট হয়ে তাঁর পুত্রকে বললেন, তোমার আচরণ ক্ষত্রিয় ধর্ম্মের বহির্ভূত; আমি যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞাশ্বের সঙ্গে তোমার রাজ্যে এসেছি, তুমি যুদ্ধ করছ না কেন? অর্জুনের তিরস্কার শুনে নাগকন্যা উলূপী পৃথিবী ভেদ করে উপস্থিত হয়ে বভ্রুবাহনকে বললেন, পুত্র, আমি তোমার মাতা (বিমাতা) উলূপী; তুমি তোমার মহাবীর পিতার সঙ্গে যুদ্ধ কর, তা হলেই ইনি প্রীত হবেন। তখন বভ্রুবাহন স্বর্ণময় বর্ম ও শিরস্ত্রাণ ধারণ ক’রে রথে উঠলেন এবং অনুচরদের সঙ্গে গিয়ে অশ্ব হরণ করলেন। অর্জুন প্রীত হয়ে পুত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তুমুল যুদ্ধের পর অর্জুন শরবিদ্ধ ও অচেতন হয়ে ভূমিতে পড়ে গেলেন। পিতার এই অবস্থা দেখে বভ্রুবাহনও মোহগ্রস্ত হয়ে ভূপতিত হলেন।

মণিপুররাজমাতা চিত্রাঙ্গদা রণস্থলে এসে পতিতপুত্রকে দেখে শোকার্ত হয়ে তাঁর সপত্নীকে বললেন, উলূপী, তোমার জন্যই আমার বালক পুত্রের হস্তে মহাবীর অর্জুন নিহত হয়েছেন। তুমি ধর্মশীলা, কিন্তু পুত্রকে দিয়ে পতিকে বিনষ্ট ক’রে তোমার অনুতাপ হচ্ছে না কেন? আমার পুত্রও মরেছে, কিন্তু আমি তার জন্য শোক না ক’রে পতির জন্যই শোকাকুল হয়েছি। আমি অনুনয় করছি, অর্জুন যদি কিছু অপরাধ ক’রে থাকেন তো ক্ষমা ক’রে এঁকে জীবিত কর। ইনি বহু- ভার্যা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু পুরুষের পক্ষে তা অপরাধ নয়। এইরূপে বিলাপ ক’রে চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের চরণ গ্রহণ ক’রে প্রায়োপবেশন করলেন।

এই সময়ে বভ্রুবাহনের চেতনা ফিরে এল। তিনি ভূপতিত পিতা ও জননীকে দেখে শোকার্ত হয়ে বললেন, আমি নৃশংস পিতৃহন্তা, ব্রাহ্মণরা আদেশ দিন আমি কোন্ প্রায়শ্চিত্ত করব। আমার উচিত মৃত পিতার চর্ম্মে আবৃত হয়ে এবং এঁর মস্তক ধারণ ক’রে দ্বাদশ বর্ষ যাপন করা। নাগকন্যা, এই দেখুন, আমি অর্জুনকে বধ ক’রে আপনার প্রিয়সাধন করেছি, এখন আমিও পিতার অনুগমন করব। এই বলে বভ্রুবাহন আচমন করে তাঁর মাতার সহিত প্রায়োপবিষ্ট হলেন।

তখন উলূপী সজীবন মণি স্মরণ করলেন; তৎক্ষণাৎ সেই মণি নাগলোক থেকে চ’লে এল। উলূপী তা হাতে নিয়ে বভ্রুবাহনকে বললেন, পুত্র, শোক করো না, ওঠ; অর্জুন দেবগণেরও অজেয়। ইনি তোমার বল পরীক্ষার ইচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছেন, তাঁর প্রীতির নিমিত্ত আমি এই মোহিনী মায়া দেখিয়েছি। এই দিব্য মণির স্পর্শে মৃত নাগগণ জীবিত হয়, তুমি পার্থের বক্ষে এই মণি রাখ। বভ্রুবাহন তাঁর পিতার বক্ষে সেই সজীবন মণি রাখলেন। তখন অর্জুন যেন দীর্ঘনিদ্রা থেকে জাগরিত হলেন এবং মস্তক আঘ্রাণ ক’রে পুত্রকে আলিঙ্গন করলেন।

অর্জুন উলূপীকে বললেন, নাগরাজনন্দিনী, তুমি ও মণিপুরপতির মাতা চিত্রাঙ্গদা কেন এখানে এসেছ? আমার বা বভ্রুবাহনের বা তোমার সপত্নী চিত্রাঙ্গদার কোনও অপরাধ হয় নি তো? উলূপী সহাস্যে বললেন, তোমরা কেউ আমার কাছে অপরাধী নও। মহাবাহু ধনঞ্জয়, তুমি মহাভারতযুদ্ধে অধর্মাচরণ করে শান্তনুপুত্র ভীষ্মকে শিখণ্ডীর সাহায্যে নিপাতিত করেছিলে। আজ পুত্র কর্তৃক নিপাতিত হয়ে তুমি সেই পাপ থেকে মুক্তি পেলে। এই প্রায়শ্চিত্ত না হ’লে তুমি মরণের পর নরকে যেতে। ভাগীরথী ও বসুগণ তোমার পাপশান্তির এই উপায় বলেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রও তোমাকে জয় করতে পারেন না; পুত্র আত্মস্বরূপ, তাই তুমি পুত্রকর্তৃক পরাজিত হয়েছ।

অর্জুন বললেন, দেবী, তুমি উপযুক্ত কার্য করেছ। তার পর তিনি বভ্রুবাহনকে বললেন, চৈত্রপূর্ণিমায় যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন, তুমি তোমার দুই মাতা এবং অমাত্যগণের সঙ্গে সেখানে যেয়ো। বভ্রুবাহন বললেন, ধর্মজ্ঞ, আমি সেই যজ্ঞে দ্বিজগণের পরিবেষক হব। আজ রাত্রিতে আপনি দুই ভার্যার সঙ্গে আপনার এই ভবনে বিশ্রাম করুন, কাল আবার অশ্বের অনুগমন করবেন। অর্জুন বললেন, মহাবাহু, আমি তোমার ভবনে যেতে পারব না; এই অশ্ব যেখানে যাবে আমাকে সেখানেই যেতে হবে। তোমার মঙ্গল হোক, আমি আর এখানে থাকতে পারব না। এই ব’লে পুত্র ও দুই পত্নীর নিকট বিদায় নিয়ে অর্জুন প্রস্থান করলেন।

বজ্রবাহু মগধে এলে সহদেবপুত্র (জরাসন্ধের পৌত্র) রাজা মেঘসন্ধি অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এলেন, কিন্তু পরাস্ত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করলেন।

অর্জুন তাঁকে যজ্ঞে উপস্থিত হবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। তার পর অর্জুন অশ্বের অনুসরণে সমুদ্রতীর দিয়ে বঙ্গ পুণ্ড্র কোশল প্রভৃতি দেশে গিয়ে সেখানকার ম্লেচ্ছগণকে পরাস্ত করলেন। দক্ষিণে নানা দেশে বিচরণ ক'রে অশ্ব চেদিরাজ্যে এল। শিশুপালপুত্র শরভ পরাজয় স্বীকার করলেন। কাশী অঙ্গ কোশল কিরাত ও তঙ্গন দেশের রাজারা অর্জুনের সংবর্ধনা করলেন, এবং দশার্ণরাজ চিত্রাঙ্গদ ও নিষাদরাজ একলব্যের পুত্র যুদ্ধে পরাস্ত হলেন। অর্জুন পুনর্বার দক্ষিণ সমুদ্রের তীর দিয়ে চললেন এবং দ্রাবিড় অন্ধ্র মাহিষক ও কোল্বগিরিবাসী বীরগণকে জয় ক'রে সুরাষ্ট্র গোকর্ণ ও প্রভাস অতিক্রম ক'রে দ্বারকায় এলেন। যাদব কুমারগণ অর্জুনকে আক্রমণ করলেন, কিন্তু বৃষ্ণি ও অন্ধকগণের অধিপতি উগ্রসেন এবং অর্জুনের মাতুল বসুদেব তাঁদের নিবারিত ক'রে অর্জুনের সংবর্ধনা করলেন।

তার পর পশ্চিম সমুদ্রের উপকূল এবং সমৃদ্ধ পঞ্চনদ প্রদেশ অতিক্রম ক'রে অশ্ব গান্ধার রাজ্যে এল। গান্ধারপতি শকুনিপুত্র বহু সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে এলেন, অর্জুনের অনুরোধেও নিবৃত্ত হলেন না। অর্জুন শরাঘাতে গান্ধারপতির শিরস্ত্রাণ বিচ্যুত করলেন। গান্ধারপতি ভীত হয়ে সসৈন্যে পলায়ন করলেন, তাঁর বহু সৈন্য অর্জুনের অস্ত্রাঘাতে বিনষ্ট হ'ল। তখন গান্ধাররাজমাতা বৃদ্ধ-মন্ত্রীর সঙ্গে অর্ঘ্যহস্তে অর্জুনের কাছে এসে তাঁকে প্রসন্ন করলেন। শকুনিপুত্রকে সান্ত্বনা দিয়ে অর্জুন বললেন, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে স্মরণ ক'রে আমি তোমার প্রাণহরণ করি নি, কিন্তু তোমার বুদ্ধির দোষে তোমার অনুচরগণ নিহত হ'ল। তার পর অর্জুন শকুনিপুত্রকে যজ্ঞে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ ক'রে হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন।